সাগর লিখছেন X=Prem নিয়ে



সৃজিত এমন একটা সময়ে X=Prem রিলিজ দিয়েছেন যখন কলকাতাই ইন্ডাস্ট্রি কনটেন্ট এর খরায় ভুগছে নিদারুণভাবে। সৃজিতের নিজের কাজ নিয়েও সমালোচনা কম হচ্ছে না। দ্বিতীয় পুরুষ, রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনো খেতে আসেন নি কিংবা ক'দিন আগের ফেলুদার গোয়েন্দাগিরিঃ দার্জিলিং জমজমাট; কোথাওই নামের সুবিচার করতে পারছিলেন না সৃজিত। তেমন একটা ক্রাইসিসের সময়ে তিনি বানিয়েছেন এক্স=প্রেম যেখানে একটা সাইফাই স্টোরিকে তিনি ডেভেলাপ করেছেন প্রেমের বোঝাপড়া দিয়ে। তার চেয়েও পজেটিভ ব্যাপার ছিলো নতুন এক্টর/একট্রেসদের দিয়ে এক্সপেরিমেন্ট চালানো।



রোড এক্সিডেন্টে আহত হয়ে মেমরি লস হওয়া এক যুবক খিলাত এর স্পেসিফিক্যালি তার প্রেমিকা/ওয়াইফ এবং কলেজ জীবনের স্মৃতি ফিরে পাওয়ার প্রচেষ্টা থেকেই এই গল্প আগাতে থাকে। পরবর্তীতে এই স্মৃতিকে ফিরে পাওয়া থেকে মেমরি ট্রান্সপ্লান্ট এর কনসেপ্টকে সামনে নিয়ে আসা হয়। মেমরি ট্রান্সপ্লান্ট এর ডিসিশান নেওয়া কিংবা গল্পের সেদিকে উৎকর্ষ আগানোর আগেই সৃজিত তার গল্প ক্যারেক্টারগুলোকে বিল্ড-আপ করেন দারুণভাবে। ফ্ল্যাশব্যাকে এই প্রেম এর বুৎপত্তি এবং পরের দিকে খিলাতের প্রেমিকা জয়ীর জন্য অর্নবের ডেসপারেটনেস আবার ট্রানপ্লান্ট প্ল্যানিংয়ের সময়ে প্যারালালি অর্নব-অদিতির কেমিস্ট্রি গড়ে উঠা সবকিছু মিলিয়ে এই সাইফাই মুভিটি গিয়ে দাঁড়ায় চতুর্ভূজ এক গল্পে। যেখানে সবাইই সবাইকে ভালবাসছেন, সবাইই ভালো থাকতে চাইছেন। 



সৃজিতের এই গল্পে কলকাতার জীবন ফুটে উঠে না। মনে হয় দিল্লীর কোনো ভার্সিটি পড়ুয়াদের জীবনাচার, কালচারাল একটা দ্বিধাবোধ আর আউট অব বাউন্ড খোশমেজাজের একটা মিশেলে দর্শককে বারবার বুঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে এই গল্পটা কলকাতাকে ঘিরে নয়। পরিচালকমাত্রই স্বাধীন। সেদিক থেকে এটা নিয়ে বলার কিছুই থাকে না। কিন্তু মডার্ণ ড্যান্স করা একটা ছেলে ২০২২ সালে এসেও কেন ধুতি পড়ে তার কলেজের ওরিয়েন্টেশন ক্লাসে যাবেন? আবার মদ খাওয়ার যে স্টাইল ওটাকে জোর করে নতুন কনসেপ্ট হিসেবে দাঁড় করানোর জায়গাগুলো খুঁত রেখে দেয়৷ এই গল্পের কনসেপ্ট এক কথায় ইন্টারেস্টিং। কিন্তু নড়বড়ে। মেমরি ট্রান্সপ্লান্ট এর কনসেপ্ট নিয়ে সিনেমা পৃথিবীতে অসংখ্য। 




Total Recall (I) (2012), Tammy and the T-Rex (1994), The man with two brains (1983) এই সিনেমাগুলো বেশ অনেকবছরের পুরনো, কিন্তু তাদের এক্সিকিউশন ছিলো চমৎকার। সৃজিত সে জায়গায় স্টোরি ডেভেলাপ করতে পারেন নি। এক্সিডেন্টের পর থেকে নিউরোসায়েন্টিস্ট এর কাছে যাওয়ার আগ অবধি সময়টায় খিলাত কিভাবে এলো তা অনুপস্থিত, কলেজ জীবনে সিনিয়র প্রেমিকার সাথে সময়টায় তার বন্ধু-বান্ধবও নেই, কিংবা যে খিলাত তার পাস্ট নিয়ে বারবার দোলাচলে সেই ২০২২ সালের খিলাত এর কি তার প্রেমিকা-বন্ধু-বান্ধব এমনকি ফেসবুকটাও নেই? যা তার মেমরি রিকল করতে সাহায্য করবে? যদি পরিচালক পুরো ব্যাপারটাকেই নাই করে দিতেন আপত্তি ছিলো না, কিন্তু তিনি ঠিক ফেসবুকের সার্চবার থেকেই অর্নবের সন্ধান দিতে পারছেন অথচ খিলাতের ফেসবুক জীবন নেই!!!



সাদা-কালো মনে হলেও এই সিনেমার কালার থিম মনোক্রোমাটিক। একটা হাই টেম্পারেচার লাইটিংয়ের ভাইব পাওয়া যাও গোটা সিনেমাজুড়েই। এই মনোক্রোম কালারে কাজ করাটা এক্স=প্রেম সিনেমাকে কিছুটা ইউনিক করে তুলেছে। নরমাল কালার টোনে এই সিনেমার স্টোরি ডেভেলাপ যথাযথভাবে হতো না বলেই ধারণা আমার। কিন্তু ডাক্তারের ল্যাব এর লাইটিংয়ের সাথে সবসময়ে যে একটা মিটিমিটি ভাব সেটা কিছুটা বিরক্তিকর মনে হচ্ছিলো। এর বাইরে লাইটিং এবং কালারের বাকি সব কাজ টপ নচ। 



জয়ী ক্যারেক্টারে শ্রুতির অভিনয় অসাধারণ না হলেও বেশ ভালো। তার এক্সপ্রেশন, ডায়ালগ ডেলিভারির ব্যালান্স এই সবকিছুই ভালো লেগেছে। এছাড়াও যখন কলেজে ভায়োলেন্স হচ্ছিলো তখনকার এক্সপ্রেশন, কিংবা সিনেমার শুরুর দিকে তার নাচ এসবকিছুই সুন্দর এক কথায়। 




খিলাত চরিত্রে অনিন্দ্য সেনগুপ্তর উদান (২০১৬) সিনেমার অভিনয় এক্সপেক্টেশন বাড়িয়ে দিয়েছিলো। সেই অনুপাতে আহামরি কিছু করতে পারেননি তিনি। অবশ্য এই স্টোরিতে তার অনেক বেশি কিছু দেওয়ার ছিলো না। হসপিটালে ভর্তি অবস্থায় তার লুকটা বেশ দারুণ লাগছিল। 


অর্জুন চক্রবর্তী বেশ অনেকদিন ধরেই অভিনয় করছেন। অর্নব চরিত্রে সহজাত অভিনয়ই দিয়েছেন। বেশ ভালো। শান্ত-মোলায়েম কিন্তু ভেতরে আগুন জ্বলছে ধাঁচের। 


এই সিনেমায় সবচেয়ে সেরা অভিনয়টা দিয়েছেন মধুরিমা বসাক। অদিতি চরিত্রটা যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং একটা চরিত্র ছিলো। এই চরিত্র সবচেয়ে কমপ্লেক্সুয়াল। তাকে প্রতিনিয়ত ভাঙ্গা এবং গড়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। নিঃসন্দেহে এই সিনেমায় অভিনয় মধুরিমাকে সামনে বেশ ভালো সুযোগ এনে দিবে। 



ভাক্তি ক্লেইন তার চরিত্রে ঠিকঠাক ছিলেন। শুধু তার মেকাপটা বড্ড নড়বড়ে ছিলো। সৃজিত মেকাপ নিয়ে যে কম ভাবেন সেটা আবারো প্রমাণ পাওয়া গেল। খিলাতের দাঁড়িও তেমনই ছিলো। নড়বড়ে, মেকি। 

সফট মিউজিক আর গানের কারণে এই সিনেমাকে আরবান এলিট মানুষরা বেশ অনেকদিন মনে রাখবেন। শ্রেয়া ঘোষাল এবং সাহানা বাজপেয়ীর কন্ঠে ভালবাসার মরশুম (মেইল ভোকাল অরিজিৎ), সিনড্রেলা, রায়কিশোরীর কন্ঠে রোদের নিশানা এই গানগুলো বেশ দারুণ। 


এমন একটা সময়ে এই সিনেমায় সৃজিত এক্সপেরিমেন্ট চালিয়েছেন আইডেন্টিটি ক্রাইসিস যখন একটা গোটা ইন্ডাস্ট্রি কনটেন্ট এর অভাবে ভুগছে। সৃজিতের কাছে দর্শকের যে এক্সপেক্টেশন থাকে সৃজিত সেটা কতটুকু পুরণ করতে পেরেছেন তা দর্শকই পরিমাপ করুক। একটি সাইফাই রোমান্টিক সিনেমা যে এলিমেন্ট নিয়ে দাঁড়ায় তার সবগুলোই সৃজিত দাঁড় করাতে পেরেছেন। গল্প অসম্পূর্ণ, কিন্তু এন্ডিং ভালো। সৃজিত দর্শককে ভাবাতে চাননি, শিক্ষা দিতে চাননি। এক্স=প্রেম কেবল ভিজুয়ালাইজ করতে চেয়েছেন। সৃজিত ভিজুয়ালাইজেশনে সফল।

Written By: Saeed Khan Shagor 
Edited by: Ankon Dey Animesh



Comments

  1. ভালোই লিখসেন ভাই। Michael Haneke এর কয়েক্টা দেখে রিভিউ দেন। আপনার এক্সপ্লেনেশন দেখতাম কত ডীপে যায়।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

চতুর্থ মাত্রা ।। আরাফাত জুয়েল ।। দেবস্মিতা সাহা

The Curious Case of Benjamin Button ।। আরাফাত জুয়েল

ইন দা মিডল অফ "Nowhere" || আরাফাত জুয়েল